ছুটি class 11
ছুটি’ গল্পে ফটিক চরিত্রটি আলোচনা করো।
অথবা, ‘ছুটি’ গল্পের প্রধান চরিত্র কোনটি? সেই চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।
বাংলা সাহিত্যে আজ পর্যন্ত যেসব দুর্দান্ত কিশোর চরিত্র পাঠকের কাছে আজও স্মরণীয় হয়ে আছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি চরিত্র হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ গল্পের ফটিক চরিত্রটি। কৈশোরের উদ্দামতা, আবেগ, অসহায়তা সবকিছু মিলিয়ে ফটিক আজও কিশোরের কিশোরবেলার প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীর অনেক কিশোর চরিত্রের মধ্যে ফটিক এক অসাধারণ, অনবদ্য এবং চমৎকার চরিত্র।
বাস্তব চরিত্র: সাধনা পর্বে লেখা ‘ছুটি’ গল্পের প্রধান চরিত্র ফটিক, রবীন্দ্রনাথের লেখা বাস্তব চরিত্রের আদলে রচিত। রবীন্দ্র-গবেষকদের লেখা থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথের দেখা দ্বারিকাপুরের চক্রবর্তীদের ছেলে হারানচন্দ্র, ফটিক চরিত্রের বাস্তবভিত্তি।
দুরন্ত দস্যি ছেলে: ফটিক পিতৃহীন, স্বভাবে বাউন্ডুলে, দরিদ্র বিধবা মায়ের দস্যি ছেলে। গ্রামের সমবয়সি ও ছোটোদের দুষ্টুমির দলপতি সে। গল্পের শুরুতে নদীর ধারে পড়ে থাকা শাল কাঠের গুঁড়িকে ঠেলে ঠেলে খেলার পরিকল্পনা তার মস্তিষ্কপ্রসূত।
সরল ও সত্যবাদী: ফটিক দুরন্ত, অবাধ্য হলেও সরল ও সত্যবাদী। খেলতে গিয়ে পড়ে গেলে অপমানিত মাখন ফটিককে অন্ধভাবে মেরেছে এবং মায়ের কাছে নালিশ করেছে। যেখানে দেখা যায়, মাখন তার মায়ের কাছে মিথ্যে কথা বলেছে। কিন্তু ফটিক মায়ের তিরস্কারের কথা ভেবেও কোনো মিথ্যা কথা বলেনি। ফটিক যে মাখনকে মারেনি এটিই সত্য, এই কথাই সে বারবার বলেছে। আমি হীপালন।
মমত্ববোধ: মা ও ভাই মাখনলালের প্রতি ফটিকের মমত্ববোধ ছিল। তাই কলকাতা যাওয়ার সময় নিজের খেলার সামগ্রী ভাই মাখনকে দিয়েছিল। আবার অসুস্থ অবস্থায় অত্যাচারিণী মাকেই সে বারবার কাছে পেতে চেয়েছিল। মায়ের জন্য ফটিকের মন বারবার বেদনাময় হয়েছিল।
লেখাপড়ার প্রতি উদাসীনতা লেখাপড়ার প্রতি উদাসীনতা ও অমনোযোগিতা ফটিক চরিত্রের সবচেয়ে বড়ো ত্রুটিময় বৈশিষ্ট্য। শহরের স্কুলে অমনোযোগী ফটিক মাস্টারমশাইয়ের কাছে বারবার অপদস্ত ও অপমানিত হয়েছে- “স্কুলে এতবড়ো নির্বোধ এবং অমনোযোগী বালক আর ছিল না।”
বয়ঃসন্ধিকালের বিড়ম্বনা: ফটিকের বয়স তেরো-চোদ্দো বছর, এই বয়সে বয়ঃসন্ধিকাল। এই বয়সের নানারকম শারীরিক, মানসিক পরিবর্তনজনিত কারণে বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়। গলার স্বর পরিবর্তন, দৈহিক বৃদ্ধি, স্নেহ ভালোবাসার কাঙাল পরিবর্তন, স্নেহ-ভালোবাসার কাঙাল, সহজ-সাবলীল মেলামেশার অভাব, কুণ্ঠাবোধ-এইসব বৈশিষ্ট্যই ফটিক চরিত্রে দেখা যায়। বয়ঃসন্ধিকালীন বিড়ম্বনা ফটিক চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
প্রকৃতির প্রতি প্রীতি: প্রকৃতির সঙ্গে মানবমনের নিগূঢ় সম্পর্কের চিত্র এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথ ফটিক চরিত্রের মধ্য দিয়ে। গ্রামবাংলার উদার আকাশের নীচে পথে-প্রান্তরে, নদীর ঘাটে ছুটির আনন্দে বন্ধুদের সঙ্গে সারাদিন ঘুরে বেড়ানোই তার জীবন। ফটিক ছিল বনের পাখির মতো। স্বচ্ছন্দ, স্বাধীন, অনন্ত-উদার নীল আকাশে আপন মনে উড়ে বেড়ানো আর গান গাওয়াতেই ছিল ফটিকের প্রাণের মুক্তি, আত্মার আনন্দ।
বিশ্বম্ভরবাবু বনের এই মুক্ত পাখি ফটিককে খাঁচায় পুরলেন। কিন্তু সেখানে মামির ভর্ৎসনা, স্কুলে মাস্টারমশাইয়ের হৃদয়হীন প্রহার, মামাতো ভাইদের নির্মম অপমানজনক ব্যবহার; সর্বোপরি মায়ের প্রতি অভিমানে সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। ফটিকের এই চলে যাওয়া ‘আপদ’ গল্পের নীলকান্তের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়।
Comments
Post a Comment