বাংলার উৎসব রচনা
- Get link
- X
- Other Apps
বাংলার উৎসব রচনা :
ভূমিকা :
বাঙালির ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা বারবার ঘনিয়েছে ।দুর্ভিক্ষ, মহামারী কিংবা দৈব দুর্বিপাক বারবার বিপন্ন করেছে বাঙালি জীবনকে ।তবুও বাঙালির আনন্দ স্রোতে ভাটা পড়েনি ,ম্লান হয়নি বাঙালির উৎসব প্রিয়তা ।কারণ বাঙালি উৎসব প্রিয় জাতি ।
উৎসব কি :
উৎসব মানে আনন্দ, উচ্ছাস; ভেদাভেদ নয়। উৎসব মানে প্রকৃত স্বর্গের নীড় রচনা; উৎসব মানে বিবেক , প্রীতি, প্রেম,উৎসব মানে মনুষত্ববোধের জাগরণ।
কল্যাণী ইচ্ছাই উৎসবের প্রাণ :
“বাঙালি ঘরকুনে” এ অপবাদ আমাদের সকলেরই জানা কিন্তু তাই বলে বাঙালি কখনই আত্মকেন্দ্রিক নয়। আত্মকেন্দ্রিক মানে আপনাতে আপনি বদ্ধ।
কিন্তু বাঙালি যদি আপনাতে আপনি বদ্ধ হতো তাহলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ হতনা। আমার আনন্দে সকলের আনন্দ হোক,আমার আনন্দ আরো পাঁচ জন উপভোগ করুক – এই কল্যাণী ইচ্ছাই হলো উৎসবের প্রাণ।সকল বাঙালির মনে এই ইচ্ছে আছে বলেইসবাই মিলেমিশে উৎসবে মেতে উঠে।
উৎসবের শ্রেণীবিভাগ :
বাঙালির উৎসবগুলিকে মূলত তিনভাগে ভাগ করা যায় -(১)ঋতু উৎসব (২)ধর্মীয় উৎসব (৩)সামাজিক -পারিবারিক উৎসব (৪)জাতীয় উৎসব ।
(ক) ঋতু উৎসব :
বাংলা ঋতুরঙ্গশালায় বিভিন্ন রঙ্গের আবির্ভাব বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে বিভিন্ন উৎসবের সমাহার ।নতুন বছরের আগমনে উদযাপিত হয় নববর্ষ।
এরপরে একেএকে উদযাপিত হয় নবান্ন ,পৌষপার্বন, মাঘোৎসব,দোলযাত্রা প্রভৃতি।
রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে বৃক্ষরোপন,বর্ষামঙ্গল,বসন্তোৎসব প্রভৃতি গুরুত্ব সহকারে উদযাপিত হয়।রবীন্দ্রনাথের ধারা অনুসরণ করে এখন শান্তিনিকেতনের বাইরেও এই উৎসবগুলি উদযাপিত হয়।
(খ) ধর্মীয়উৎসব :
নানান সম্প্রদায়ের বাস এই বাংলায়।সকল সম্প্রদায়ই আপন আপন ধর্মীয় উৎসবে মেতে ওঠে।হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজা ।
শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনাকে কেন্দ্র করে কয়েক দিনের জন্যে জাতিধর্ম নির্বিশেষে বাঙালি উৎসবে মেতে ওঠে ।
এরপরেই একেএকে আসে লক্ষীপূজা,কালীপূজা,জগদ্ধাত্রী পূজা, সরস্বতী পূজা প্রভৃতি।এছাড়াও মুসলিম সম্প্রদায়ের ঈদ,মহরম,সবেবরাত এবং ক্রিস্টিয়ানদের বড়োদিন,গুডফ্রাইডে শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হয়।
(গ) সামাজিক -পারিবারিক উৎসব :
মানুষ সামাজিক জীব।ব্যক্তিগত আনন্দ উৎসবকে সে ভাগ করে নিতে চায় আর পাঁচজনের সঙ্গে ।
বিবাহ,অন্নপ্রাশন,জন্মদিন, উপনয়ন,ভ্রাতৃদ্বিতীয়া -এই পরিবারকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানগুলিও শেষ পর্যন্ত বাঙালির সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে ।
এগুলির মধ্যে দিয়ে আত্মীয়স্বজন ,বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গেও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে।সুদৃঢ় হয় সামাজিক বন্ধন।
(ঘ) জাতীয় উৎসব :
বিভিন্ন রকম জাতীয় উৎসবে বাঙালি মুখরিত হয় যেমন ২৩ শে জানুয়ারি নেতাজীর জন্মদিন, ২৬ শে জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবস, ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস, ১৪ নভেম্বর শিশু দিবস, 2 অক্টোবর মহাত্মা স্মরণে, ৫ই সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস, ১৪ই এপ্রিল আম্বেদকর দিবস প্রভৃতি।
বাঙালি প্রাণের ঐতিহ্য রবীন্দ্র জন্মোৎসবকে জাতীয় উৎসবের মর্যাদা প্রদান করেছে। সর্বজাতিক ভারতের চরিত্রধর্মে ঐক্যবদ্ধবাঙালিও। তাই এই বিভিন্ন রকম উৎসব পালনে তার জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রকাশিত হয়।
উৎসবের একাল ও সেকাল :
বর্তমানে উৎসব বলতে বোঝানো হয় আলোকসজ্জা, মন্ডপসজ্জা, জাকজমক। এতে নেই কোন প্রাণ বন্দনা, নেই কোন আন্তরিকতা, নেই কোন প্রীতি প্রেমের পণ্য মন।অথচ পূর্বে উৎসব বলতে বোঝানো হতো সত্যিকারের আন্তরিকতা। আলোকসজ্জা বা জাঁকজমক না থাকলেও সমর উৎসব মা নেই ছিল প্রীতি ও প্রেমের মায়াবী বন্ধন।
উৎসবের মধ্য দিয়েই মিলন :
ব্যাক্তিগত দুঃখ কষ্ট ভুলে সবার সাথে আনন্দে মেতে ওঠায় উৎসবের প্রধান উদ্দেশ্য।উৎসবানুষ্ঠান নিবার্ধ মেলামেশার সুযোগ করে দেয় আমাদের।
উৎসবের ময়দানে জাতি ধর্ম অর্থ গত ভেদাভেদের কোনো কোনো প্রাচীর থাকেনা। পারস্পরিক আনন্দ প্রীতি বিনিময়ের মধ্য দিয়েই রচিত হয় সুন্দর সুন্দর বন্ধুত্ব।
জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের এই আনন্দে মেতে ওঠা বাঙালির উৎসব পালনকে করে তোলে স্বার্থক।
উপসংহার :
উৎসবের মূল চেতনা হল মানুষের কল্যাণ সাধন ।দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছতা ,গতানুগতিকতা থেকে মুক্তি পেতে মানুষের মন সততই আকুল ।উৎসব মানুষের জীবনের এই চাহিদাকে পুরন করে।উৎসব মিলন ও শান্তির বাণী বহন করে ।নিজস্বতা ,বৈচিত্র্য ও আড়ম্বরে সমৃদ্ধ বাংলার উৎসব বাঙালির জীবনকে করেছে আনন্দময় ও পরিপূর্ণ।
- Get link
- X
- Other Apps
Comments
Post a Comment